• chanakyabangla

বরফ গলাতে শুভেন্দুর সঙ্গে আলোচনায় অভিষেক, মঙ্গলে কথা মমতার সঙ্গেও


বরফ গলাতে শুভেন্দুর সঙ্গে আলোচনায় অভিষেক, মঙ্গলে কথা মমতার সঙ্গেও

চানক্য বাংলা ওয়েব ডেস্ক:

বরফ কি গলতে শুরু করল? তৃণমূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে লাগাতার সুর চড়িয়ে এবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠকে বসলেন শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার তাঁর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা।


কখনও তিনি জল্পনায় জল ঢালছেন, আবার নতুন জল্পনার রসদও জোগাচ্ছেন। অরাজনৈতিক মঞ্চ থেকে সম্প্রতি পর পর কিছু ইঙ্গিতবাহী মন্তব্য করার পর শনিবার নন্দীগ্রামে একটি বিজয়া সম্মিলনির মঞ্চ থেকে তৃণমূল নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, 'আমি প্যারাসুটে নামিনি। লিফটে করেও উঠিনি । সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে উঠে এসেছি। তাই ও সব করে কোন লাভ হবে না।' এই মঞ্চ থেকেই শুভেন্দু ঘোষণা করেছেন, ১০ নভেম্বর নন্দীগ্রামে সূর্যোদয়ের দশক পূর্তিতে বড় সমাবেশ করবেন। শুধু তাই নয়, বিজেপির তরফেও বারবার 'দরজা' খুলে রাখার কথা বলছেন দিলীপ ঘোষ, সায়ন্তন বসু, সৌমিত্র খাঁ'রা। দিকেদিকে যখন এই জল্পনা ছড়াচ্ছে, তাহলে কি বিজেপিতেই যাচ্ছেন শুভেন্দু? ঠিক তখনই ঘুরতে শুরু করল খেলা। এদিন সকালেই কলকাতা আসেন শুভেন্দু। সূত্রের খবর, সন্ধ্যায় তাঁর সঙ্গে বৈঠকে বসেন তৃণমূল সাংসদ তথা যুব তৃণমূলের সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিষেক-শুভেন্দু 'দ্বৈরথ' নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে কম আলোচনা হয়নি। এমনকী দলের প্রতি শুভেন্দুর 'বিরূপ' হওয়ার আসল কারণ অভিষেক বলেই মনে করেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ। সেই অভিষেক এদিন শুভেন্দুর সঙ্গে বৈঠক করলেন বলেই সূত্রের খবর। আর সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত বক্সীর মতো তৃণমূলের শীর্ষ নেতারাও। তাৎপর্যপূর্ণ হল, মঙ্গলবারই মমতার সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে শুভেন্দুর। স্বাভাবিক কারণেই ফের শুভেন্দুকে নিয়ে পারদ চড়ছে রাজ্য রাজনীতিতে।


এই বৈঠকের পরই শুভেন্দু যেন ফের দলের অনুগত হয়ে গিয়েছেন। দলবদল প্রসঙ্গে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, 'সব মিডিয়ার বাজার গরম করার জল্পনা-কল্পনা। আপনারা এখনও পর্যন্ত আমার পার্টির বিরুদ্ধে কোনো মন্তব্য করতে শুনেছেন ? আমি দলের মধ্যে থেকে বা কোন সরকারি পদে থেকে দলের বিরোধিতা করতে পারি না। যাদবপুরের একজন তৃণমূল সাংসদ ছিলেন, তিনি পার্টির টিকিটে দলের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন। আমার বিরুদ্ধে যাদের দিয়ে বলানো হচ্ছে, তাদের কোনও যোগ্যতা নেই। ভোটেও নেই। আমি ছড়িয়ে থাকা ফুল দিয়ে মালা গাঁথি। আমি ভোটের ডিরেক্টর।'


মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয় কিনা, জানতে চাওয়া হলেও তিনি জানিয়ে দেন, 'আপনারা আমাকে কী ভাবেন ? দলের সর্বোচ্চ নেত্রীর সঙ্গে আমার কোন কথা হবে না, এমনটা হয় নাকি?' বিজেপির উদ্দেশ্যেও তাঁর বার্তা, '২০-২৫ টা আসন বাদ দিয়ে সব আসনেই লড়াই হবে সোজাসুজি তৃণমূল বনাম বিজেপি। আমার বিধানসভা কেন্দ্র নন্দীগ্রামের কথা বলতে পারি। সেখানে কেউ দাঁত ফোটাতে পারবেন না।'


বেশ কিছুদিন ধরেই নাম না করে দলের বিরুদ্ধেই মুখ খুলছিলেন শুভেন্দু। তবে তাঁর আক্রমণের অভিমুখ কাদের দিকে তা খোলসা করেননি তিনি। কারা প্যারাশুটে করে নেমে এসেছেন বা লিফটে করে উঠে এসেছেন তাও নাম করে বলছেন না। কলেজ রাজনীতি থেকে তাঁর ক্রম উত্থানের কাহিনী কেন স্মরণ করাচ্ছেন তাও স্পষ্ট করেন নি। এরই পাশাপাশি তাঁকে নিয়ে চলা যাবতীয় জল্পনা উপেক্ষো করার পরামর্শ দিয়েছেন অনুগামীদের। সেই সূত্রেই রবিবার তিনি বলেন, 'যতক্ষণ আমার মুখে কিছু না শুনছেন ততক্ষণ বাজারি সংবাদপত্র ও ঘরে বসে এসি চালিয়ে পোর্টালগুলো যা লিখছে তা উপেক্ষা করুন। নিজের কাজ করুন। এগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ছোট লোকদের দিয়ে বাজে কথা বলিয়ে ভাবছে আমি উত্তর দেব। আমার লেবেলটা ওই নাকি! কুকুর মানুষের পায়ে কামড়ালে মানুষ কি কুকুরের পায়ে কামড়ায়?'


সাম্প্রতিক সময়ে তিনি সরাসরি দলের কর্মসূচি এড়িয়ে চলছেন বলে পূর্ব মেদিনীপুরের রাজনীতিতে বেশ কৌতুহল তৈরি হয়েছে। নন্দীগ্রাম কলেজ মাঠের বিজয়া সম্মিলনীতেও দলীয় পতাকা দেখা যায়নি। শুভেন্দু জানান, বিজয়া সম্মিলনী দল, মত, সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময়ের অনুষ্ঠান। ঈদেও সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ পরস্পরের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এগুলি সামাজিক অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়। তবে বিজয়া সম্মিলনীর মঞ্চে আবু তাহের, মেঘনাদ পালের মতো তৃণমূল নেতারা উপস্থিত ছিলেন।


শুভেন্দু নিজেকে আন্দোলন করে উঠে আসা নেতা হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও জেলা স্তরে বরাবরই তাঁর বিরোধী গোষ্ঠীর নেতা তথা রামনগরের বিধায়ক অখিল গিরির অবশ্য দাবি, 'উনি তো দলের সাজানো বাগানে এসেছেন। আর এখন সেই বাগানের ক্ষতি করছেন।' এর আগেও অখিল সংবাদমাধ্যমে মন্তব্য করেছিলেন,'পদের দরকার না-থাকলে উনি পদ আঁকড়ে রয়েছেন কেন? ছেড়ে দিন না।' কয়েক দিন আগে দিঘা এসে তৃণমূলের প্রথম সারির নেতা ফিরহাদ হাকিমকেও পড়তে হয়েছিল শুভেন্দু সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখে। ফিরহাদ সরাসরি উত্তর এড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আউড়ে বলেন,'পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি, মূর্তি ভাবে আমি দেব হাসেন অন্তর্যামী।' দলের রাজ্য নেতৃত্ব এসব নিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে জেলা সভাপতি শিশির অধিকারীর বক্তব্য, 'শুভেন্দু অধিকারী একজন প্রতিষ্ঠিত নাগরিক। বয়সও হয়েছে। তাঁর কথা তিনি বলেছেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করুন। আমায় করছেন কেন? আমি ডেফিনিটলি তৃণমূলের লোক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমার নেত্রী।' তাঁর সংযোজন, 'উনি প্রদেশ স্তরের নেতা। ওঁকে নিয়ে এই সব উত্তর জেলা থেকে কেউ দিতে পারবে না।'


নিজের সংগ্রামী ইতিহাস তুলে ধরতে শুভেন্দু আরও বলেন,'বিনয় কোঙার বলেছিলেন লাইফ হেল করে দেবে। লক্ষণ শেঠ বলেছিল নয়াচরে ঢুকলে ঠ্যাং কেটে হাতে ধরিয়ে দেবে। যেদিন এ কথা বলেছে। তারপর দিন আমি নয়াচরে গিয়েছি ।' তাঁর হাত ধরে তৃণমূলে আসা কিছু লোক এখন তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করছে বলেও ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন শুভেন্দু। তিনি বলেন,'এক সময় যাদের হাত ধরে সিপিএম থেকে এনেছিলাম তারাই এখন বন্ধ ঘরে বসে অন্যের সঙ্গে গুজগুজ ফুসফুস করছে । কিন্তু এ সব করে কোন লাভ হবে না।'


বক্তৃতার শেষে তিনি তিনি 'জয় নন্দীগ্রাম' আওয়াজ তোলেন। ঘোষণা করেন, ১০ নভেম্বর নন্দীগ্রামে রক্তাক্ত সূর্যোদয়ের দশক পূর্তিতে গোকুলনগরে খেজুরি ও নন্দীগ্রামের মানুষদের নিয়ে বড় সভা করবেন। আর এই সুযোগেই সৌমিত্র খাঁ, দিলীপ ঘোষ, সায়ন্তন বসুরা বারবার বলতে থাকেন, 'আমরা দলের দরজা বড় করে খুলে রেখেছি। কেউ যদি রাজনীতি করতে চান, আমাদের দলে তাঁকে আমরা স্বাগত জানাব।' ক্রমেই জল্পনার পারদ চড়তে শুরু করে, তাহলে কি বিজেপিই শুভেন্দুর পরের গন্তব্য? কিন্তু না, সোমবার সন্ধ্যা থেকেই পালটাতে শুরু করল প্লট। অভিষেক নিজে গিয়ে বৈঠক করলেন শুভেন্দুর সঙ্গে। মঙ্গলে বৈঠক মমতার সঙ্গে। তাহলে বরফ গলতে শুরু করল? অপেক্ষায় রাজনৈতিক মহল।