• চাণক্য বাংলা

ভারতের বিরুদ্ধে মধ্যযুগীয় রণকৌশল চিনের, ‘গুয়ান দাও’ হামলার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে পিএলএ

ডিজিটাল ডেস্ক: পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ্ প্রযুক্তির ফাইটার জেটের যুগে ভারতের বিরুদ্ধে মধ্যযুগীয় রণকৌশল নিয়েছে চিন। ভারতের সঙ্গে চিনের সীমান্ত বিবাদ চলছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় উত্তেজনা কমার আপাতত কোনও লক্ষণ নেই। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় জওয়ানদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য পিপলস লিবারেশন আর্মিকে বিভিন্ন ধারালো অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আমেরিকান সংবাদমাধ্য়ম সূত্রে এমনটাই খবর মিলেছে।

১৫ জুন পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় চিনা সেনার সঙ্গে সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা শহিদ হন। তারপর থেকেই দু’দেশের সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকেছে। বেশ কয়েকবার সেনা-কমান্ডার স্তরে আলোচনা হলেও সীমান্তে উত্তেজনা কমেনি। বরং দিন দিন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। ডিসএনগেজমেন্ট (সেনা পিছোনো) ও ডি-এসকেলেশনে (সেনা কমানো) চিন রাজি হয়নি।

সম্প্রতি চিনা সেনার কিছু ছবি প্রকাশ্য এসেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, ভারতীয় সেনার ওপর হামলার জন্য বল্লম, কুকরি, স্বয়ংক্রিয় বন্দুক নিয়ে প্রস্তুত রয়েছে পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)। এরই মধ্যে আমেরিকার একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের সঙ্গে লড়াইয়ে মধ্যযুগের রণকৌশল অবলম্বন করেছে চিন। লাদাখের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় ভারতের মোকাবিলা করতে মধ্যযুগে রোমান নাইটদের যেভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো, ঠিক সেভাবেই চিনা সেনাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলে সূত্রের খবর।

আমেরিকার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, হালবার্ডস দিয়ে পিপলস লিবারেশন আর্মিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। হালবার্ড একটি ধারালো অস্ত্র। চতুর্দশ, পঞ্চদশ ও  ষোড়শ শতাব্দীতে এই অস্ত্র যুদ্ধে ব্যবহৃত হতো। এছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে অন্য ধারালো অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে চিনা জওয়ানদের। কারণ হিসেবে যেটা উঠে এসেছে, ১৯৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী, লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার দুই কিলোমিটার (১.৩ মাইল) এলাকার মধ্যে দুদেশের জওয়ানরা আগ্নেয়াস্ত্র বা বিস্ফোরক ব্যবহার করতে পারবেন না। যার ফলে ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার শুরু করেছে চিনা সেনা। রাশিয়ান ডিফেন্স সাইট দামবিয়েভ বলছে, চিনা সেনার হাতে গুয়ান দাও নামে একটি ধারালো অস্ত্র রয়েছে। এটি অনেকটা হালবার্ডের মতো। যার মধ্যে বাঁকানো ব্লেড রয়েছে। গুয়ান দাওয়ের ওজন ২ থেকে ৫ কেজি হতে পারে।

চিন হঠাৎ করে মধ্যযুগীয় রণকৌশল স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বেড়েছে ভারতের। দুই দেশের কাছেই আধুনিক যুদ্ধের বিভিন্ন সরঞ্জাম রয়েছে। লাদাখের আকাশে ভারতের মিরাজ ২০০০, সুখোই ৩০ এমকেআই, মিগ ২৯, চিনুক উড়ছে। এছাড়া ভারত ও চিনের তরফে সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় ট্যাংক, অ্যান্টি এয়ার ক্র্যাফট মিসাইলও মোতায়েন করা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। ইতিমধ্যেই ভারতের বিমানবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে পাঁচটি রাফায়েল যুদ্ধবিমান। অপরদিকে চিনের পঞ্চম প্রজন্মের স্টেল্থ প্রযুক্তির জে ২০ চেংডু যুদ্ধবিমানও হুঙ্কার ছাড়ছে। যেকোনও মুহূর্তে সীমান্তে ছোটখাট যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে অনুমান সমর বিশেষজ্ঞদের। তাই লাদাখ, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ সহ দীর্ঘ চিন-ভারত সীমান্তে সতর্ক রয়েছেন ভারতীয় জওয়ানরা। তবে পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ্ যুদ্ধ বিমানের যুগে চিনের মধ্যযুগীয় রণকৌশল ভাবাচ্ছে বিশেষজ্ঞদের।

এদিকে, গত সোমবার সন্ধ্যায় প্যাংগং হ্রদের দক্ষিণ পাড়ে রেচিন লা-রেজাংলা-মুখপাড়ি এবং মাগার হিলের মাঝামাঝি এলাকায় খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল চিনা ও ভারতীয় সেনা। বর্তমানে দুই দেশের জওয়ানরা লাদাখের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় কার্যত মুখোমুখি অবস্থান করছে। কয়েকদিন আগেই বল্লম, কুকরি, স্বয়ংক্রিয় বন্দুক হাতে ৪০-৫০ জন চিনা সেনার ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। সোমবার লাদাখের মুখপাড়ি চূড়া দখলের চেষ্টায় ছিল লালফৌজ। যদিও ভারতীয় জওয়ানরা লালফৌজের সেই চেষ্টা ভেস্তে দিয়েছিল।

মঙ্গলবার ভারতের তরফে জানানো হয়, সোমবার সন্ধ্যায় পূর্ব লাদাখের ভারতীয় সেনা চৌকিতে আচমকা আক্রমণের জন্য চিনা সেনা বল্লম, কুকরি, স্বয়ংক্রিয় বন্দুক নিয়ে জড় হয়েছিল। পিএলএ-এর চেষ্টা ছিল, লাদাখের মুখপাড়ি চূড়া এবং রেকিন লা অঞ্চল থেকে ভারতীয় সেনাদের অপসারণ করা এবং সেগুলির দখল নেওয়া। কিন্তু ভারতীয় জওয়ানরা চিনা সেনার সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দিয়েছে। সম্প্রতি রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ও চিনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েই ফেংহে বৈঠক করেন। কিন্তু তারপরও লাদাখে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় অবস্থার কোনও পরিবর্তন হয়নি। উলটে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ইতিমধ্যেই শি জিনপিং সরকারের তরফে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, চিন এক ইঞ্চিও জমি ছাড়বে না। ফলে লাদাখের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় উত্তেজনা যে আপাতত থামছে না, এটা বলাই যায়। তবে বল্লম, স্বয়ংক্রিয় বন্দুক, ধারালো অস্ত্র হাতে চিনা সেনার ছবি প্রকাশ্যে আসা ও ভারতের বিরুদ্ধে চিনের মধ্যযুগীয় রণকৌশল গ্রহণ করা দুদেশের সম্পর্ককে নিঃসন্দেহে আরও জটিল করে তুলবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা।